পৃথিবীর কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বিমানবাহিনী সচিব ট্রয় মেইঙ্ক সম্প্রতি জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী কক্ষপথে এমন কিছু ‘স্পেস কন্ট্রোল উইপন’ বা মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ অস্ত্র মোতায়েন করেছে, যা পৃথিবীতে থাকা মার্কিন বাহিনীকে শত্রুপক্ষের হামলা থেকে সুরক্ষা দেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটনের এমন নজিরবিহীন ও প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী—উভয় পক্ষের মধ্যেই গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মহাকাশকে সামরিক প্রতিযোগিতার উন্মুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার বার্তা মিলল, যার প্রধান নিশানা চীন ও রাশিয়া। সামরিক বাহিনীগুলোর ক্ষেত্রে জিপিএস, যোগাযোগ ও গোয়েন্দা তথ্যের মূল উৎস এসব স্যাটেলাইট। একইসঙ্গে বিশ্বের বেসামরিক অবকাঠামোও মহাকাশভিত্তিক পরিষেবার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফলে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে লক্ষ্যবস্তু করার ঝুঁকি এখন বহুগুণ বেড়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সিকিউর ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের মহাকাশ নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ভিক্টোরিয়া স্যামসনের মতে, মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে বিভিন্ন প্রযুক্তির কথা বললেও সরাসরি ‘অস্ত্র’ শব্দটি এড়িয়ে গেছেন। কক্ষপথে পরিকল্পিতভাবে তৈরি কোনো অস্ত্র স্থাপনের বিষয়টি এভাবে স্বীকার করা এটাই প্রথম।
মেইঙ্ক জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন কক্ষপথে এমন অস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের কর্মকাণ্ড থেকে যৌথ মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম। তবে এগুলো কবে কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে, কতগুলো মোতায়েন করা হয়েছে কিংবা ঠিক কী ধরনের অস্ত্র—এসব বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি। মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের এসব সক্ষমতা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক দুই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যেতে পারে বলেও জানান মেইঙ্ক।
তবে মহাকাশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো কোনো ‘কিলার স্যাটেলাইট’ বা সরাসরি আঘাতকারী কাইনেটিক অস্ত্র হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, স্যাটেলাইটের মুখোমুখি সংঘর্ষে বিপুল পরিমাণ মহাকাশ-বর্জ্য তৈরি হয়, যা নিজস্ব মহাকাশযানের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো মূলত অ-ধ্বংসাত্মক ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা বা রেডিও-যোগাযোগ জ্যামিং প্ল্যাটফর্ম, যা শত্রুর স্যাটেলাইটের সংকেত অকার্যকর করে দিতে সক্ষম।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে গঠিত মার্কিন ‘স্পেস ফোর্স’ দেশের সামরিক ব্যবস্থার সবশেষ সংযোজন। নাসার মতো বেসামরিক সংস্থার বিপরীতে এটি সম্পূর্ণ সামরিক কাঠামোর অংশ, যা ইউএস স্পেস কমান্ডের অধীনে কাজ করে। সামরিক স্যাটেলাইট সুরক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিপক্ষের হুমকি মোকাবিলাই এর প্রধান কাজ। পেন্টাগনের দাবি, চীন ও রাশিয়া মার্কিন সক্ষমতা ব্যাহত করতে নিত্যনতুন কাউন্টারস্পেস প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে, যা এই ধরনের অস্ত্র মোতায়েনকে অনিবার্য করেছে।
মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি থাকলেও সব ধরনের অস্ত্রের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা নেই। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি এ ক্ষেত্রে প্রধান আন্তর্জাতিক চুক্তি। এতে কোনো দেশকে পৃথিবীর কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র বা অন্য কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন কিংবা মহাকাশে এ ধরনের অস্ত্র রাখার অনুমতি দেয়া হয়নি। চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর ওপর সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং অস্ত্র পরীক্ষা করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে, প্রথাগত বা অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্রের বিষয়ে এতে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। আইনি এ ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়েই শক্তিধর দেশগুলো মহাকাশে নিজেদের আধিপত্য বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ বক্তব্যের পর বেইজিং ও মস্কো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এবং ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ—উভয়েই মহাকাশকে সব ধরনের অস্ত্রমুক্ত ও নিরস্ত্রীকরণের আন্তর্জাতিক আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রতিবেদন বলছে, চীন ও রাশিয়া নিজেরাও কাইনেটিক এবং নন-কাইনেটিক কাউন্টারস্পেস প্রযুক্তি তৈরি ও পরীক্ষা করে আসছে। স্যাটেলাইট জ্যামিং ছাড়াও দুটি দেশই কক্ষপথে অত্যন্ত কাছে গিয়ে অন্য স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ বা কক্ষপথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে।
মহাকাশের এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু তিন পরাশক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। ভারত, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইসরায়েলও নিজস্ব অ্যান্টি-স্যাটেলাইট কিংবা ইলেকট্রনিক মহাকাশ-প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে। এমনকি ইরানও স্যাটেলাইট সেবা ব্যাহত করতে জ্যামিং প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের দাবি, ২০০৭ সাল থেকে চীন-রাশিয়ার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেই তারা প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি কমাতে চেয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন শঙ্কা প্রকাশ করছেন। ভিক্টোরিয়া স্যামসন সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন এ স্বীকারোক্তির পর চীন, রাশিয়া বা মিত্রদেশগুলোও তাদের মহাকাশ অস্ত্রের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে উৎসাহিত হবে। এতে মহাকাশে অস্ত্রায়নের গতি বহুগুণ ত্বরান্বিত হবে।
মহাকাশে যুদ্ধ বা সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লে তার মাশুল গুণতে হবে পুরো বিশ্বকে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সাধারণ মানুষ কোনো না কোনোভাবে স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য, যোগাযোগ ও আবহাওয়া পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল। মহাকাশে যেকোনো বড় সংঘাত এই যোগাযোগব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে সাধারণ জীবনের ওপর।
আমার বাঙলা/রাজীব