মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৩ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
ইসলামী ব্যাংকের সামনে গ্রাহক ফোরাম ও চাকরিচ্যুতদের অবস্থান কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শহীদ সেনাসদস্যদের পরিবারের সাক্ষাৎ রায়েরবাজারে অবৈধ অটোরিকশা গ্যারেজে অভিযান, মালিক গ্রেপ্তার ভবিষ্যৎমুখী আইনেই এগোবে বাংলাদেশ | Amar Bangla BANGLADESH জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারি উদ্যোগে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ার নয়: আইনমন্ত্রী হামের প্রাদুর্ভাবে ৮ শিশুর মৃত্যু নভেম্বরে ইউপি ভোট, শুরু স্থানীয় নির্বাচন শিক্ষা-প্রযুক্তিতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চান রাষ্ট্রপতি এক সপ্তাহে নিরাপদ খাদ্য আইনে ২৮ লাখ টাকা জরিমানা ও ২০ মামলা ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের রায় মঙ্গলবার কাল থেকে কারখানায় চাহিদামতো গ্যাস-বিদ্যুৎ: প্রধানমন্ত্রী আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ: দুদক সিলেট সফরে আসছেন রাষ্ট্রপতি | Amar Bangla BANGLADESH মেট্রোরেলের গাবতলী – দাশেরকান্দি রুট একনেকে উঠছে বুধবার জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৎ সাহস থাকলে দেশে ফিরে আসুন : সমাজকল্যাণমন্ত্রী বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সরকার সচেতন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সবার জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে: ডা. জুবাইদা রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অতীতের ১৫ বছর থেকে নতুন দিকে নিতে চাই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির

শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি নয়, চাই মুক্তবুদ্ধির চর্চা

সীমু দা
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩৮ অপরাহ্ন
%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%A8%E0%A7%87 %E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF %E0%A6%A8%E0%A6%AF%E0%A6%BC %E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%87 %E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BF%E0%A6%B0 %E0%A6%9A%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%BE

শিক্ষককে হতে হয় জ্ঞানের বাহক, বিবেক জাগ্রত করার সহযাত্রী এবং মানুষ গড়ার কারিগর—কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারক নয়। একজন শিক্ষক কেবল একজন পেশাজীবী নন; তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও মানবিক বোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যবিষয়ের জ্ঞানই অর্জন করে না; তারা শেখে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়, যুক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয় এবং সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হয়। ফলে শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচরণ, মূল্যবোধ, বৌদ্ধিক সততা ও পেশাগত নৈতিকতার প্রভাব অনেক সময় পাঠ্যপুস্তকের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে।


শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে তোলা নয়; বরং তাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা, বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি করা। এখানেই শিক্ষকতার সঙ্গে রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিক্ষক যখন তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানকে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তার বিকাশে কাজে লাগান, তখন তিনি প্রকৃত অর্থে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সেই অবস্থান যখন কোনো নির্দিষ্ট দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্রেণিকক্ষ তখন মুক্ত সংলাপ ও অনুসন্ধানের ক্ষেত্র না হয়ে মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তারের জায়গায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।


শিক্ষক ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন


একজন শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক হতেই পারেন। তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকাও স্বাভাবিক। তাই শিক্ষককে সম্পূর্ণ রাজনীতিবিমুখ করার ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তবে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি। শ্রেণিকক্ষ, একাডেমিক মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীর সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক কোনো দলীয় আনুগত্য বা রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে না।


কারণ শিক্ষক যখন রাজনৈতিক পরিচয়কে শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা কিংবা আচরণের মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়। শিক্ষার্থীর কাছে তখন বার্তা যায়—যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য শক্তিশালী এবং সত্যের চেয়ে ক্ষমতার নৈকট্য বেশি মূল্যবান। এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীর স্বাধীন বিচারবোধকে দুর্বল করে এবং তাকে জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে গোষ্ঠীগত অবস্থান অনুসরণে অভ্যস্ত করে তুলতে পারে।


জ্ঞানের জগতে কোনো বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা বক্তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার প্রমাণ, যুক্তি, পদ্ধতি ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর। এই মৌলিক বোধটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করাই শিক্ষার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।


শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক চেতনা


মার্কিন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জন ডিউই শিক্ষা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর চিন্তায় শিক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক জীবনচর্চার অন্যতম ভিত্তি। গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; এটি এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করে, অন্যের মত শোনে, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে এবং সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়।


এই সংস্কৃতির চর্চা শুরু হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রয়োজন এমন শিক্ষক, যিনি শিক্ষার্থীর চিন্তার স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করবেন, মতের বৈচিত্র্যকে সম্মান করবেন এবং যুক্তিবোধ, অনুসন্ধিৎসা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশে সহায়তা করবেন।


একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হবেন—এমন কোনো প্রয়োজন নেই। বরং মতভেদ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সম্মানজনক ও যুক্তিনির্ভর সংলাপ করা যায়, সেটিই শিক্ষার্থীদের শেখানো জরুরি। শিক্ষক কোনো নির্দিষ্ট মত গ্রহণের নির্দেশ দেবেন না; বরং শেখাবেন কীভাবে কোনো মতের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ খুঁজতে হয়, যুক্তির শক্তি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে হয় এবং নিজের পূর্বধারণাকেও প্রশ্ন করতে হয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতাই একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে দক্ষ পেশাজীবীর পাশাপাশি বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করতে পারে।


রাজনৈতিক সচেতনতা ও দলীয় আনুগত্য এক নয়


গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা অপরিহার্য। তারাই ভবিষ্যতের নাগরিক, পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক ও নেতৃত্বের সম্ভাব্য ধারক। রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, পরিবেশ, বৈষম্য ও জননীতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানার এবং মতামত গঠনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।


তবে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং দলীয় আনুগত্য এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক সচেতনতা মানুষকে বিভিন্ন মত ও অবস্থান বুঝতে এবং নিজের বিবেক ও যুক্তির আলোকে মতামত গঠনে সহায়তা করে। অন্যদিকে দলীয় আনুগত্য অনেক সময় ব্যক্তির স্বাধীন বিচারবোধকে একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক অবস্থানের অধীন করে ফেলে।


একজন সচেতন নাগরিক একই সঙ্গে সরকারের কোনো নীতিকে সমর্থন করতে পারেন এবং অন্য কোনো নীতির সমালোচনা করতে পারেন। কোনো রাজনৈতিক দলের একটি অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েও একই দলের অন্য কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতন্ত্রে নাগরিকের চূড়ান্ত আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়; বরং সংবিধান, আইন, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা ও জনকল্যাণের প্রতি হওয়া উচিত।


বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রশ্ন ও বিতর্কের জায়গা


বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, নতুন ধারণা পরীক্ষা করা এবং বিকল্প ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সুযোগ থাকার কথা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের শিক্ষার্থী যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।


একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করল, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং কতজন শিক্ষার্থী সেখানে এসে নিজের চিন্তার সীমা অতিক্রম করতে শিখল, প্রচলিত ধারণাকে যুক্তির আলোকে পরীক্ষা করল এবং নতুন প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করল—সেটিই তার বড় সাফল্য।


কিন্তু শিক্ষাজীবনের প্রধান পরিচয় যখন দলীয় আনুগত্যে পরিণত হয়, তখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। শিক্ষার্থীর মেধা, গবেষণার আগ্রহ ও একাডেমিক পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মতভিন্নতা তখন স্বাভাবিক বৌদ্ধিক বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচিত না হয়ে শত্রুতা বা বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষণ হিসেবে দেখা শুরু হতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজের প্রকৃত মত প্রকাশের পরিবর্তে নিরাপদ অবস্থান বেছে নিতে শেখে।


এ ধরনের পরিবেশ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব ভবিষ্যৎ কর্মজীবন, সামাজিক সম্পর্ক ও নাগরিক আচরণেও পড়তে পারে।


রাজনীতিমুক্ত নয়, দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাঙ্গন


বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন জায়গাও হতে হবে না, যেখানে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ থাকবে। বরং সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও মতাদর্শকে যুক্তি, তথ্য ও নৈতিকতার আলোকে যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে।


একজন শিক্ষার্থী রাজনীতি করবেন কি না, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হবেন কি না—এটি তাঁর নাগরিক স্বাধীনতার বিষয়। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একাডেমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন এবং একই কারণে অন্যায্য সুবিধাও না পান, তা নিশ্চিত করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।


বিশেষ করে আবাসিক হল, ছাত্রসংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং একাডেমিক প্রশাসনে দলীয় প্রভাব যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিকল্প কাঠামো তৈরি করে, তখন শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থী স্বাধীন নাগরিক হওয়ার পরিবর্তে কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের অনুসারী হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে।


আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উচ্চশিক্ষা সংস্কৃতি, যেখানে রাজনৈতিক মত থাকবে, কিন্তু দলীয় দাসত্ব থাকবে না; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকবে, কিন্তু একাডেমিক উৎকর্ষ ও নাগরিক মর্যাদার বিনিময়ে নয়।


রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ: মুক্তিরশিক্ষা ও মুক্তচিন্তার আলোচনায় রবীন্দ্র শিক্ষা


শিক্ষা ও মুক্তচিন্তার আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জন করবে না; প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সমাজ ও মানবতার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে।


তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল মানুষের সামগ্রিক বিকাশ—শরীর, মন, বুদ্ধি, নন্দনবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক চেতনার সমন্বিত বিকাশ। শান্তিনিকেতনের শিক্ষাপরিবেশে তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানবিক সম্পর্ক, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং স্বাধীন চিন্তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।


রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা ছিল মুক্তির পথ—অজ্ঞতা থেকে মুক্তি, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি, ভয় থেকে মুক্তি এবং অন্ধ আনুগত্য থেকে মুক্তি। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখতে পারে, নিজের বুদ্ধিতে বিচার করতে পারে এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে পারে।


আজকের বাংলাদেশে তাঁর এই শিক্ষাদর্শ নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার, যা শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে না; বরং জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার এবং প্রয়োজন হলে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা দেবে।


নজরুলের শিক্ষা: সাহস ও মানবিকতার পাঠ


কাজী নজরুল ইসলামও শিক্ষাকে কেবল তথ্য ও জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি। তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি, আত্মমর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা।


নজরুল এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন থাকবে না। তাঁর চিন্তায় শিক্ষা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেবে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি জোগাবে এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলবে।


তাঁর বিদ্রোহ ছিল শুধু রাজনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে নয়; অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সামাজিক অবিচার ও চিন্তার দাসত্বের বিরুদ্ধেও। তাই নজরুলের মুক্তচেতা মানবতাবাদ আজকের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।


বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে যে প্রশ্ন


আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আমাদের মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা আসলে কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই?


শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা, ডিগ্রি অর্জন কিংবা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাই কি শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য? নিশ্চয়ই নয়। জাতীয় উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। কিন্তু সেই দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি, সৎসাহস ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটলে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণ কঠিন।


রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন মানুষের অন্তর্গত সম্ভাবনা ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশের কথা। নজরুল শিখিয়েছেন অন্যায়, বৈষম্য ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। একজন দেখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সৌন্দর্য, অন্যজন দেখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার শক্তি। এই দুই ধারার মানবিক ও মুক্তিকামী শিক্ষা আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় বিশেষভাবে প্রয়োজন।


শিক্ষার লক্ষ্য তাই কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, সাহসী ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। এমন শিক্ষা প্রয়োজন, যা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, আবার অন্যের কথা শুনতেও শেখাবে; নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে, আবার অন্যের অধিকারকে সম্মান করতেও উদ্বুদ্ধ করবে; নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করবে, আবার বৃহত্তর মানবতার সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করবে।


উপসংহার


একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার নাগরিকরা কতটা স্বাধীনচেতা, যুক্তিবাদী, নৈতিক ও মানবিক হয়ে উঠছে তার ওপর। আর সেই নাগরিক তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো শিক্ষাঙ্গন।


তাই শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন তাকে দলীয় প্রভাব, ভয়, পক্ষপাত ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্ত রাখা। শিক্ষক হবেন জ্ঞানের পথপ্রদর্শক, কিন্তু কোনো দলের প্রচারক নন; বিশ্ববিদ্যালয় হবে বিতর্কের ক্ষেত্র, কিন্তু বিভাজন ও সহিংসতার নয়; শিক্ষার্থী হবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন, কিন্তু অন্ধ আনুগত্যের বাহক নয়।


আজকের বাংলাদেশে আমাদের প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করবে না; নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সত্যের কাছে সৎ, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং মানবতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ করে তুলবে। এমন শিক্ষাই পারে মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলতে এবং একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের ভিত্তি শক্তিশালী করতে।


আমার বাঙলা/ রাব্বি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Theme Created By