চিকিৎসকদের নিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় এবং যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের নির্দেশিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় এবং ওষুধ ব্যবহার প্রসঙ্গে চিকিৎসকদের নিয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে “অবৈজ্ঞানিক”, “অনভিপ্রেত” এবং ““অনাকাঙ্ক্ষিত” বলে অভিহিত করেছেন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) এর কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম এবং জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন।
রবিবার (১৭ আগস্ট) এনডিএফ’র অফিস সম্পাদক ডা. এ কে এম জিয়াউল হকের সই করা এক বিবৃতিতে একথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে চিকিৎসক নেতারা তার এমন মন্তব্য চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও পেশাদারত্বকে অস্বীকার করার শামিল। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করে এনডিএফ। নেতারা এমন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে তার অযাচিত মন্তব্য প্রত্যাহার এবং দেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকরা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। বিশেষ করে, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ছাত্র-জনতাকে স্বেচ্ছাসেবামূলকভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদানে চিকিৎসকরা জনতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। একইসঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ডেঙ্গুসহ নানা স্বাস্থ্য সংকটে বহু চিকিৎসক জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় অত্যন্ত সীমিত সম্পদ এবং প্রতিকূল পরিবেশে বাংলাদেশের চিকিৎসকরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জনগণকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, চব্বিশের আন্দোলনে ট্রান্সফার, শাস্তি, চাকরি হারানো ঝুঁকি, পুলিশি হয়রানি ও নানাবিধ চাপ উপেক্ষা করে মানবিকতার উদাহরণ স্থাপন করা চিকিৎসকদের এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রশ্নবোধক। তার এই মন্তব্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে।
তারা আরও জানান, বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনের চেয়ে কম বরাদ্দ, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী সংকট, পর্যাপ্ত বেডের স্বল্পতা, বেতন-ভাতা কম ইত্যাদি সত্ত্বেও বাংলাদেশের চিকিৎসকরা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত নিরলসভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। তবুও চিকিৎসকরা তাদের সেবা ও মানবিকতার পথ থেকে কখনও পিছপা হননি।
এনডিএফ নেতারা মনে করেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তার স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার পরিবর্তে চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ চিকিৎসকদের সমালোচনায় মুখর হওয়া ভালো ইঙ্গিত বহন করে না। বরং যেখানে বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ দেশে অতি সম্প্রতি ওপেন হার্ট বাইপাস সার্জারি করেছেন, দেশের চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা রেখেছেন, দেশের জনগণের কাছে বাংলাদেশের চিকিৎসক এবং চিকিৎসাসেবার মানকে উচ্চে তুলে ধরেছেন, সেখানে তার বক্তব্য জনগণকে বিভ্রান্ত করছে, বাংলাদেশের চিকিৎসক এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণকে ভুল বার্তা দিচ্ছে, অনাস্থা সৃষ্টি করছে। এতে রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চলে যেতে পারেন।
নেতারা বলেন, আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই—চিকিৎসকরা দিনরাত মানুষের জীবন বাঁচাতে লড়াই করছেন। সীমিত অবকাঠামো, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাহীন পরিবেশ এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও চিকিৎসকরা নিরলসভাবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করা মানে কেবল চিকিৎসকদের নয়, বরং সমগ্র স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও দেশের জনগণের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা
এসময় এনডিএফ দাবি করেছে, উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে অবিলম্বে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে এবং দেশবাসীর কাছে প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। চিকিৎসক সমাজের সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিবৃতিতে এনডিএফ নেতারা বলেন, আমরা চিকিৎসক সমাজের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় সব সময় সর্বাত্মক আন্দোলনে যেতে প্রস্তুত। গঠনমূলক পর্যালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য, তবে তা বস্তুনিষ্ঠ এবং সম্মানজনক হতে হবে। এনডিএফ চিকিৎসক এবং চিকিৎসাসেবার মর্যাদা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং রোগী তথা দেশের জনগণের স্বাস্থ্যের অধিকারের পক্ষে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করে যাবে।