শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৩৯ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেন নেতানিয়াহু টাঙ্গাইলে দুই গ্রামের সংঘর্ষ: ১৪৪ ধারা জারি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মায় পড়ে গেছে যাত্রীবাহী বাস আকাশ প্রতিরক্ষার নতুন শক্তি তৈরি করল ইরান ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত গাছে উঠেছিলেন আম পাড়তে, ফিরলেন লাশ হয়ে! আমার একটা ছাওয়াল আছে, আমি খালাস চাই: সোহেল হাদি হত্যা নিয়ে জামায়াত আমিরের পিএসের সম্পৃক্ততার দাবি বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে ১৫-২০ শতাংশ, আজ ঘোষণা তীব্র গরমের মধ্যে স্বস্তির খবর দিল আবহাওয়া অফিস ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ-জলকামান ঈদকে পুঁজি করে বালিয়াড়ি দখল, গড়ে উঠল শত শত দোকান প্রথম দিনে দেশে ফিরলেন ৬১৭৫ হাজি ১০ কোটি টাকা: অভিযোগ নিয়ে হাসনাত-প্রশাসকের ফোনালাপ ১৪০০ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ‘শেখ হাসিনার চিঠি’ প্রথম ফিরতি হজ ফ্লাইটে দেশে ফিরলেন ৪১৯ হাজি  যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ঠেকাতে সুবিশাল সামরিক কমপ্লেক্স চীনের দুপুরের মধ্যে আট অঞ্চলে ঝড়ের আভাস বাংলাদেশিদের আর জামাই আদর করা হবে না: শুভেন্দু অধিকারী মুষলধারে বৃষ্টি শুরু ঢাকায়, থাকবে কত দিন

বন্যা বা সংকটে মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকা জরুরি

সীমু দা
শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:২২ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, হাওড় অঞ্চল ও উপকূলীয় বেশ কিছু জেলা প্রায় প্রতি বছর বন্যায় আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যা ছাড়াও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে জলসংকটে পড়ে এই অঞ্চলের মানুষজন, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। এই অঞ্চলগুলোতে বন্যা ও জলসংকটের সময় নারীদের ঋতুস্রাব বা মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে একটি হলো, বন্যা বা জলসংকটের সময় নারীদের মাসিক বন্ধ রাখা উচিত; যাতে তারা পরিচ্ছন্ন থাকতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন এবং নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা এই ভ্রান্ত ধারণা বা মিথটি খণ্ডন করে দেখাবো কেন এটি ভুল এবং কীভাবে এর বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। 

মিথ: বন্যা বা জলসংকটের সময় নারীদের মাসিক বন্ধ রাখা উচিত, যাতে তারা পরিচ্ছন্ন থাকতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

বাস্তবতা: নারীদের ঋতুস্রাব বা মাসিক একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া; যার সঙ্গে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী সরাসরিভাবে পরিচিত। বাংলাদেশে ৫৪ মিলিয়ন নারী ও মেয়ের ঋতুস্রাব হয়। এর মধ্যে ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন কিশোরী। মাসিক নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের অংশ। জোরপূর্বক বা কৃত্রিম উপায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মাসিক বন্ধ রাখা নারীদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে।

সমাজে এই মিথ কেন প্রচলিত?

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে মাসিক নিয়ে কুসংস্কার ও নিষেধাজ্ঞা বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত, যা মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি থেকে উদ্ভূত। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি, মাসিক সম্পর্কে অপর্যাপ্ত তথ্য এবং মাসিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত পণ্যের সীমিত প্রবাহ আমাদের সমাজে মাসিক সম্পর্কিত মিথগুলো টিকিয়ে রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে মাত্র ৩০-৩৬ শতাংশ মেয়ে তাদের প্রথম মাসিকের আগে মাসিক সম্পর্কে জানে। এছাড়াও মাসিক পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দাম একটি বড় সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে ৮৬ শতাংশ গ্রামীণ বিদ্যালয়ের মেয়ে প্যাড কিনতে অক্ষম এবং ৬৮ শতাংশ নারী কেনার সময় অস্বস্তিবোধ করেন। স্কুল ও জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা, গোপনীয়তা ও নিরাপদ পানির অভাব ইত্যাদি কারণে জলসংকটের সময় মাসিক স্বাস্থ্য চর্চা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই বন্যার সময় ‘মাসিক বন্ধ রাখা উচিত’ এমন ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে অজ্ঞতা, পরিবার ও সমাজের চাপ এবং ধর্মীয় কারণে এ সব বিষয় নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের সীমিত ভূমিকা এই মিথকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষত, মাসিক নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ব্যবহারের প্রচলন এই ধারণাকে প্রসারিত করেছে। মাসিক নিয়ন্ত্রণের জন্য যে সব ওষুধ বাজারে পাওয়া যায় তা মূলত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসার নির্দিষ্ট প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপব্যবহারের কারণে অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এ সব ওষুধ মাসিক বন্ধ রাখা বা বিলম্বিত করার জন্য ব্যবহার করেন; যা নারীদের এক ঝুঁকি কমাতে গিয়ে আরও বৃহৎ পরিসরের ঝুঁকির সম্মুখীন করে তোলে।

এই মিথের প্রভাব

নারীদের মাসিক বন্ধ রাখতে বা বিলম্বিত করতে যে ধরনের হরমোনাল ট্যাবলেট বাজারে পাওয়া যায়, তাতে থাকে নরএথিস্টেরন; যা প্রোজেস্টেরনের কৃত্রিম রূপ। এই ট্যাবলেট শরীরে কৃত্রিমভাবে প্রোজেস্টেরনের উচ্চমাত্রা বজায় রেখে মাসিককে বিলম্বিত করতে সাহায্য করে। তবে নিয়মিতভাবে এই ট্যাবলেট গ্রহণ নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাসিক বিলম্বিত করার জন্য হরমোনাল ট্যাবলেট গ্রহণ একজন নারীর স্বাভাবিক ঋতুচক্রে কুপ্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি পরবর্তী মাসিকের সময় অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হতে পারে। সাময়িক অপ্রস্তুত অবস্থা এসব অঞ্চলের নারীদের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে; যা সচেতনতার অভাব, সামাজিক ট্যাবু এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে আরও জটিল হয়ে ওঠে। মাসিক বিলম্বিত করার ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনের ফলে ওজন বৃদ্ধি, তলপেটে ব্যথা, হৃদরোগ, পেশিতে টান ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও ‘ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস’ (রক্ত জমাট বেঁধে ধমনীতে আটকে যাওয়া), হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, পালমোনারি এমবোলিজমের (ফুসফুসীয় ধমনী আটকে যাওয়া) মতো গুরুতর রোগও হতে পারে। তাছাড়াও এ ধরনের হরমোনাল ওষুধ যকৃতের মাধ্যমে শোষিত হয় বলে তা অন্য ওষুধের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত বা নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। এই ওষুধ ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক ঋতুচক্রে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তা নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে এবং স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে।

মিথ বনাম বাস্তবতা: বন্যা বা সংকটে মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকা জরুরি

সম্ভাব্য সমাধান

এই সমস্যা সমাধানে কিছু স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন–

১. জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে পৃথক টয়লেট, পানির ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মাসিক স্বাস্থ্য কর্নার রাখা।

২. টিউবওয়েল ডুবে গেলে নিরাপদ পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করা বা ক্লোরিন/ওআরএস ট্যাবলেট ব্যবহার করা।

৩. মাসিকের কাপড় জীবাণুমুক্ত করার জন্য রোদে শুকাতে দেওয়া। প্রয়োজনে ডেটল বা অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে ধুয়ে ব্যবহার করা।

৪. ব্যবহৃত প্যাড পানিতে ফেলা যাবে না। একটি ঢাকনাযুক্ত ড্রাম বা বালতিতে জমা করে কয়েকদিন পর নিরাপদ জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা (এটি আদর্শ নয়, তবে পানিদূষণের চেয়ে ভালো)।

৫. বন্যা বা সংকটে মাসিক বন্ধ থাকা উচিত এই ভুল ধারণা দূর করতে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, মায়েদের সম্পৃক্ত করা।

৬. শিক্ষক, মা ও কমিউনিটি নেতাদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

৭. ছেলেদেরও বিষয়টি নিয়ে সংবেদনশীল করে তোলা।

৮. স্বল্পমূল্যের পুনঃব্যবহারযোগ্য ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্যাড উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা। (প্রয়োজনে সরকারিভাবে ভর্তুকি বা ভাউচার দেওয়া)

৯. এসডিজি ও জাতীয় স্যানিটেশন কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কৌশলে মাসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা।

১০. দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় নারীদের সিদ্ধান্তগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ বৃদ্ধি করা।

জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা ও নানা তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় এটি সহজেই অনুমেয় যে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা আরও নাজুক অবস্থায় উপনীত হবে। তাই জাতীয় ও সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় নারীদের ক্ষমতায়ন, অংশগ্রহণ ও মাসিক ব্যবস্থাপনার মতো জরুরি বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখা উচিত, মাসিক কোনও রোগ নয়; এটি নারীদের স্বাভাবিক শারীরিক চক্রের অংশ। বন্যা বা সংকটকালে অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রম যেমন থেমে থাকে না, তেমনই মাসিক বন্ধ রাখার কোনও যৌক্তিকতা নেই। বরং স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ইউথ পলিসি ফোরাম ও ‘অধিকার এখানে, এখনই’ প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি প্রথম পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরও জানতে ভিজিট করুন-


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Theme Created By