অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিত জীবনযাত্রা এবং তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূল শর্তগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল। দেশটির শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা ‘বিটসেলেম’-এর প্রকাশিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত সংস্থাটির ১৯৮৯ সালের পর থেকে সবচেয়ে বিস্তৃত এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হামলা মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই পরিকল্পিত আক্রমণ কোনো বিক্ষিপ্ত বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুসংগঠিত কাঠামোগত নীতির অংশ, যা মূলত পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে বিভক্ত: সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শন, চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি, সামাজিক ও রাজনৈতিক পতন ঘটানো এবং জাতিগত নিধন ও ভূখণ্ড দখল। ফিলিস্তিনিরা যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, সন্তানদের স্কুলে নিতে না পারে, চিকিৎসা সেবা বা পৌর সুবিধা না পায় কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে না পারে—সেজন্য একটি অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সামগ্রিক চক্রান্তের মূল চালিকাশক্তি হলো ইসরায়েলের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যার নেতৃত্বে রয়েছেন চরমপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। পশ্চিম তীরের বেসামরিক বিষয়গুলোর ওপর যার রয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা। মূলত ২০১৭ সালে স্মোট্রিচ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডিসাইসিভ প্ল্যান’ বা সিদ্ধান্তমূলক পরিকল্পনাকেই এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের ব্লুপ্রিন্ট বা মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি বিকল্প রাখা হয়েছিল—আধিপত্য মেনে নিয়ে জাতীয় দাবি ত্যাগ করা, এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া অথবা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হিংসাত্মক দমনের মুখোমুখি হওয়া। বর্তমানে এই নীতিটিই সরকারের বাজেট, ক্ষমতা এবং নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে নজিরবিহীন গতিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া তীব্র আগ্রাসনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েকমাসে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সহিংসতায় ১,১০৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে ৬৪টি পূর্ণাঙ্গ সম্প্রদায়কে। রাস্তাঘাট ও গ্রামের প্রবেশদ্বারগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নরকে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অসুস্থ রোগী বা শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথেও চেকপোস্টের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে, যা মানুষের ন্যূনতম মর্যাদাবোধকেও ভুলুণ্ঠিত করছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ফিলিস্তিনিদের চরম অবরুদ্ধ বা শ্বাসরোধ করে রাখা হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কেড়ে নেওয়া, সম্পদ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা প্রদানের ক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেকারত্বের হারে। ২০২২ সালে পশ্চিম তীরে বেকারত্বের হার যেখানে ছিল মাত্র ১৩.১ শতাংশ, সেটি বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৩১.৩ শতাংশে। অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ নিজেই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যার ফলে খাদ্য সহায়তার জন্য মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ।
শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর ওপরও চালানো হচ্ছে নিয়মিত দমনপীড়ন। শ্রমিক, নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষাকারী বিভিন্ন তৃণমূল সংগঠনের অফিস আকস্মিক তল্লাশি চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের। বিটসেলেমের মতে, এই বহুমুখী হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনিদের একটি জাতি হিসেবে ভেঙে ফেলা, যাতে তাদের ভূমি, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সামাজিক বন্ধন চিরতরে মুছে ফেলা যায় এবং সেখানে স্থায়ীভাবে ইহুদি বসতি ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।