একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়; অনেক সময় তা একটি জাতির চেতনা, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংকটের সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে প্রতিষ্ঠান নিজস্ব সীমানা অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তেমনই একটি নাম। দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জাগরণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনন্য অবদান। গৌরব ও সংগ্রামের ১০৫ বছর অতিক্রম করে আজ ১০৬তম বর্ষে পদার্পণ করেছে দেশের প্রাচীনতম এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ব বাংলায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের দাবি জোরালো হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সফরকালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। পরে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন নেতাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিষয়টি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯১২ সালে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরের বছর কমিটির ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে উদ্যোগটি কিছু সময়ের জন্য থমকে যায়। পরবর্তীতে স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ এবং ১৯২০ সালে ভারতীয় আইনসভায় ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে সব বাধা দূর হয়। অবশেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রমনার প্রায় ৬০০ একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই বিদ্যাপীঠ তখনই পূর্ব বাংলার মানুষের উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
প্রতিষ্ঠার সময় তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির। সময়ের পরিক্রমায় তা দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৮৪টি বিভাগ, ৬০টি ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। প্রায় ৪৬ হাজার শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছে এবং দুই হাজারের বেশি শিক্ষক পাঠদান ও গবেষণায় নিয়োজিত।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার একাডেমিক অর্জনের বাইরে। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল অগ্রভাগে। রাষ্ট্রের সংকটময় সময়ে এই ক্যাম্পাস বারবার হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, সাহস ও মুক্তচিন্তার কেন্দ্র।
১০৬তম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। দিবসটি উপলক্ষে আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শোভাযাত্রাসহ স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সমবেত হন। পরে উপাচার্যের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়।
সকাল ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন হলের পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এ সময় সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত, বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন।
এরপর টিএসসি মিলনায়তনে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে বিকেলে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদেরা উচ্চশিক্ষা, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্র গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করবেন।
দিবসটি উপলক্ষে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বেলা আড়াইটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত যানবাহন এবং জরুরি সেবার গাড়ি ছাড়া অন্য যানবাহনের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে।
এক শতকেরও বেশি সময় ধরে জ্ঞানচর্চা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মুক্তবুদ্ধির যে ধারাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লালন করে আসছে, ১০৬ বছরে এসেও সেই ঐতিহ্য সমানভাবে অটুট। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে যেমন এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে পথ দেখিয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণেও এর ভূমিকা থাকবে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাজু/নিএ
!function(f,b,e,v,n,t,s)
{if(f.fbq)return;n=f.fbq=function(){n.callMethod?
n.callMethod.apply(n,arguments):n.queue.push(arguments)};
if(!f._fbq)f._fbq=n;n.push=n;n.loaded=!0;n.version=’2.0′;
n.queue=[];t=b.createElement(e);t.async=!0;
t.src=v;s=b.getElementsByTagName(e)[0];
s.parentNode.insertBefore(t,s)}(window,document,’script’,
‘
fbq(‘init’, ‘481304049944631’);
fbq(‘track’, ‘PageView’);