প্রতিদিন সকালেই পূর্ব জেরুজালেমের শুফাত শরণার্থী শিবিরের ১৭ বছরের কিশোর মোহাম্মদের ঘরটিতে যান তার মা ফিদা জালাবানি। গোছানো বিছানা আর জামাকাপড় ঠিক করেন, যেগুলো দিনশেষেও একেবারেই untouched বা অক্ষত থাকে। কারণ, আজ থেকে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে ইসরায়েলি বাহিনী যখন মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, তারপর থেকে সে আর এই ঘরে পা রাখতে পারেনি।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয়। চেকপোস্টে একটি বাসে সেনাকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে সে তার এক বন্ধুকে ইসরায়েলি সেনার গুলিতে নিহত হতে দেখেছিল। সেই ঘটনার সময় এক নিরাপত্তা রক্ষীর গুলিতে আক্রান্ত সেনাই মারা যান, আর এর জন্য মোহাম্মদকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাগারে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও অনাহার : মা ফিদা জানান, গত প্রায় দুই বছর ধরে তাকে মেগিদো কারাগারে তার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে ছেলের স্বাস্থ্য নিয়ে তিনি চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। তার বিশ্বাস, মোহাম্মদসহ অন্যান্য শিশু বন্দিদের ওপর নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে।
কারাগারের আইনজীবীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, শিশু বন্দিরা বেশিরভাগ দিনই ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। ১৩ জন বন্দির জন্য মাত্র চার টুকরো রুটি বরাদ্দ থাকে। এছাড়া অতিরিক্ত ভিড় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে সেখানে স্ক্যাবিস বা চুলকানিসহ বিভিন্ন চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও কারা কর্তৃপক্ষ সবসময় অনাহারের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবুও বন্দি শিশুদের ওপর সেল রেইড, মারধর এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা শক্ত করে বেঁধে রাখার মতো অমানবিক আচরণ নিয়মিত ঘটে চলেছে।
ফিলিস্তিনি বন্দি অধিকার সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর থেকে কেবল অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকেই প্রায় ১,৯০০ ফিলিস্তিনি শিশুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগারে অন্তত ৩৬০ জন ফিলিস্তিনি শিশু বন্দি রয়েছে।
‘সে তো কেবলই একটি শিশু’ : অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরে তাম্মুন এলাকার ১৬ বছরের কিশোরী ওলা কাতিশাত। গত ২৪ মে ঠিক মধ্যরাতে বোনের উচ্চমাধ্যমিক পাস করার আনন্দ নিয়ে কথা বলছিল সে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের বাড়িতে হানা দিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগে ওলাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। কী সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। এই আকস্মিক গ্রেপ্তার এখনো তাদের পরিবারের জন্য চরম একটি ধাক্কা।
মুক্তির পরও কারাগারের বিভীষিকা : বে বেথেলহেমের-এর দক্ষিণ দিকের বেইত ফাজ্জার এলাকার ১৬ বছরের মুইন সালাহাত গত বছরের জুনে ১৬ মাসের প্রশাসনিক আটকাদেশ (কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই কারাবাস) শেষে মুক্তি পায়। তবে কারাগারের দিনগুলো তার পিছু ছাড়ছে না।
কারাগারে থাকার সময় সে স্ক্যাবিস রোগে আক্রান্ত হলেও কোনো চিকিৎসা পায়নি। মুক্তির পরও তার শরীরে গুরুতর চর্মরোগের ক্ষত রয়ে গেছে, যা তাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। তার বাবা গাসসান জানান, মুইন এখন আগের মতো স্বাভাবিক নেই। খাওয়ার সময় হঠাৎ থালায় খাবার রেখে সে ঘোরের মধ্যে চলে যায় এবং কারাগারের সেই জঘন্য খাবার ও সেনাসদস্যদের অকারণে সেলে গ্যাস ক্যানিস্টার নিক্ষেপ করে শিশু বন্দিদের দম বন্ধ করে ফেলার রোমহর্ষক বর্ণনা দিতে শুরু করে। কারাগারে দীর্ঘদিন পিছিয়ে পড়ার কারণে সে এখন পড়াশোনা ছেড়েই দিতে চাচ্ছে।
কারাগারের বাইরে এসেও এই শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে যে ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল তাদের ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং পুরো একটি প্রজন্মের ওপর গভীর ক্ষত তৈরি করছে।
আমার বাঙলা/রাজীব