দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারের নিয়মিত প্রস্তুতি থাকা জরুরি। প্রতি চার বছর পরপর ব্যাপক পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার প্রয়োজন থাকলেও ২০২০ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ ধরনের কার্যক্রমে ঘাটতি ছিল।
তার দাবি, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আগের সরকার ইউনিসেফের ডেলিগেটেড পদ্ধতিতে সরাসরি কেনাকাটার বদলে ওপেন টেন্ডারে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিদেশি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। এতে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয় এবং দীর্ঘ সময়ের ঘাটতির চাপ বর্তমান সরকারকে সামলাতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই পরিস্থিতির কারণে অনেক পরিবারকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ শিশুর মধ্যে প্রায় এক হাজার শিশু মারা গেছে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, একটি শিশুর মৃত্যুও অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং কোনো মায়ের সন্তান হারানোর কষ্টের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে ইউনিসেফের নির্ধারিত তিন ধাপে ১৮টি জেলায় কর্মসূচি চালানো হয়। পরে এর আওতায় ঢাকা ও আরও দুটি বড় সিটি করপোরেশনে বাড়ানো হয়।
৪ মে থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও তা এগিয়ে ২০ এপ্রিল থেকেই সারা দেশে কার্যক্রম চালু করা হয়। ওই কর্মসূচির মাধ্যমে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির সমস্যাও দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া এবং এর সঙ্গে থাকা অপুষ্টি।
অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা হাম আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় তাদের ফুসফুসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক চিশতি মাত্র ১৫০ টাকা ব্যয়ে বোতলভিত্তিক একটি সিপ্যাপ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যেসব শিশু স্বাভাবিকভাবে অক্সিজেন নিতে পারছিল না, তাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছে। এতে অনেক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের ঘনবসতির কারণে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত শিশুর কাছাকাছি থাকা অন্য শিশুদের মধ্যেও সহজেই সংক্রমণ ছড়াতে পারে। একই বিছানায় একাধিক শিশুর থাকা কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি যাতায়াতের মাধ্যমেও রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে যেখানে ২ কোটি ২৫ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেখানে হাম-রুবেলা কর্মসূচিতে টিকা পেয়েছিল ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু। দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শিশুর ব্যবধানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপর আগের ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরদিন থেকে ঈদুল আজহার পরদিন পর্যন্ত আরও প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে শনাক্ত করে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এবার নতুন করে ক্যাচআপ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ইউনিসেফ ১০ দিনের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করেছে। আগের মজুতের সঙ্গে নতুন টিকা যুক্ত করে এবার ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই ৩৪ লাখ শিশুর মধ্যে ১০ লাখ নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং বাকি ২৪ লাখ আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশু।
শনিবার থেকে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাম্প এবং প্রতিটি উপজেলায় প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ইউএনও ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে জোরদারভাবে টিকাদান শুরু হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কর্মসূচি সফল করতে তিনি গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন।
কর্মজীবী মায়েদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ছুটির দিনেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পরও টিকাদান কার্যক্রম চালু থাকবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এই ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, চলমান কর্মসূচি শেষে প্রায় ১০ লাখ ডোজ টিকা মজুত থাকবে। এরই মধ্যে ৪৩ লাখ ডোজ বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতের মপআপ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার জন্যও প্রয়োজনীয় টিকা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংকটে চিকিৎসকদের ভূমিকার প্রশংসা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মহামারি ও জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের চিকিৎসকরা দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করে আসছেন। করোনাভাইরাসের সময় চিকিৎসকদের পরিশ্রম ও ত্যাগের কথাও স্মরণ করেন তিনি।