কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্তজুড়ে ইয়াবা কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট। তবে স্থানীয়দের দাবি, পাঁচ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পালংখালীর যুবদল নেতা আবুল ফয়েজ যেন হঠাৎ করেই হয়ে ওঠেন সীমান্তপথের অন্যতম প্রভাবশালী ‘নিয়ন্ত্রক’। এক সময়ের রিক্তহস্ত এই যুবনেতার চলাফেরা এখন অনেকটা ধনকুবেরদের মতো। এলাকায় রয়েছে একাধিক ব্যবসা, নতুন নতুন জমি ক্রয়, বিলাসবহুল জীবনযাপন আর প্রাইভেটকারে চলাফেরা।
কিন্তু সম্প্রতি র্যাবের হাতে আড়াই লাখ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনার পর নতুন করে বেকায়দায় পড়েছেন তিনি।
তার বিরুদ্ধে উঠেছে অপহরণ, নির্যাতন ও মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ। আর সেই অভিযোগ অস্বীকার করতে গিয়ে এবার প্রকাশ্যে পবিত্র কুরআন মাথায় তুলে শপথও করতে হয়েছে তাকে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৮ মে। ওইদিন ভোরে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফারির বিল এলাকায় সৈয়দুল ইসলামের বসতবাড়ি সংলগ্ন একটি বাঁশঝাড় থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় আড়াই লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে র্যাব-১৫। ঘটনাটি সীমান্তজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এত বড় চালান সাধারণ কোনো কারবারির নয়; এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া। র্যাব জানায়, ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মামলা হয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে তদন্ত শুরুর আগেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে নতুন গুঞ্জন- কারা এই চালানের তথ্য ফাঁস করেছে?
স্থানীয় সূত্র বলছে, ইয়াবার চালান উদ্ধারের পর থেকেই সীমান্তভিত্তিক কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, চালান ধরা পড়ার জন্য কয়েকজনকে দায়ী করে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি শুরু হয়। আর সেই চাপের কেন্দ্রে উঠে আসে যুবদল নেতা আবুল ফয়েজের নাম।
গত বুধবার কক্সবাজার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন সাখাওয়াত হোছাইন মুন্না, মোজাম্মেল হক, হেলাল উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন ও হাবিবুল বাশার। সেখানে তারা সরাসরি অভিযোগ করেন, ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের অপহরণ ও নির্যাতন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক বলেন, আড়াই লাখ ইয়াবার চালান ধরা পড়ার পেছনে আমাদের দায়ী করা হচ্ছে। সেই মাদকের টাকা ফেরত চাওয়া হচ্ছে। আবুল ফয়েজ ও তার লোকজন আমাদের অপহরণ করে মারধর করেছে। এখনো বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শুধু হুমকিই নয়, এলাকায় তাদের পরিবারকেও আতঙ্কে রাখা হচ্ছে। বাড়িঘরে হামলার ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তবে অভিযোগ ওঠার পরদিনই পাল্টা অবস্থান নেন আবুল ফয়েজ। বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সংবাদ সম্মেলন করে পবিত্র কুরআন মাথায় তুলে শপথ করেন তিনি।
ফয়েজ বলেন, ‘আমি অপহরণ করিনি। তারা একেক সময় একেক কথা বলছে। মুন্না নিজেই একজন চিহ্নিত মাদককারবারি। সাড়ে তিন লাখ ইয়াবা নিয়ে সে তিন বছর কারাগারে ছিল। আমার নামে কোনো মাদক মামলা নেই। কুরআন ধরে বলছি, আমি যদি দোষী হই তাহলে আমার উপর আল্লাহর গজব পড়ুক।’
তিনি আরও দাবি করেন, আসন্ন ইউপি সদস্য নির্বাচনে তার জনপ্রিয়তা ও সম্ভাব্য জয় ঠেকাতেই একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, কুরআন হাতে শপথ দিলেও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। বিশেষ করে, অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার কথা বললেও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগের নির্দিষ্ট জবাব দেননি ফয়েজ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে সীমান্ত এলাকায় আবুল ফয়েজের প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন পয়েন্টে তার ‘কথাই শেষ কথা’ বলে অভিযোগ রয়েছে। টেকনাফ-উখিয়ার মাদক রুটে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তার নাম নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, সীমান্তপথে ইয়াবা আনা-নেওয়া, নিরাপদ গুদাম নির্বাচন এবং চালান ‘ম্যানেজ’ করার পেছনে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী যুবনেতা সক্রিয়। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংস্থা সরাসরি ফয়েজের সম্পৃক্ততার কথা বলেনি। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার বিকেলে পালংখালীর বটতলী স্টেশন এলাকায় আবুল ফয়েজের সমর্থনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশ নেন শতাধিক নারী-পুরুষ। ইউনিয়ন ও উপজেলা বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আবুল ফয়েজের পরিবার দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে কষ্ট করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ান। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’
উখিয়া উপজেলা শ্রমিকদলের সভাপতি আব্দুল মালেক মানিক বলেন, ‘ফয়েজ দলের নিবেদিত কর্মী। রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয় করতে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
তবে স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কারণ একই ঘটনায় দুই পক্ষই পরস্পরকে মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, আড়াই লাখ ইয়াবার এই বিশাল চালানের প্রকৃত মালিক কারা? কারা নিয়ন্ত্রণ করে সীমান্তের এই মাদক রুট? আর কেনই বা চালান উদ্ধারের পরপরই অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এলো? উখিয়ার সীমান্তজুড়ে ইয়াবা কারবার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে, রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থের প্রভাব এবং স্থানীয় আধিপত্যকে ব্যবহার করে একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। মাঝেমধ্যে বড় চালান ধরা পড়লেও মূল গডফাদাররা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আড়াই লাখ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অভিযান, নাকি এর পেছনে রয়েছে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বড় কোনো দ্বন্দ্ব? র্যাব-১৫ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। তদন্তের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত বলে দেবে, কুরআন ছুঁয়ে করা শপথ কতটা সত্য, আর অভিযোগের ভেতরে লুকিয়ে আছে কতটা বাস্তবতা।
সালাউদ্দিন/সাএ
!function(f,b,e,v,n,t,s)
{if(f.fbq)return;n=f.fbq=function(){n.callMethod?
n.callMethod.apply(n,arguments):n.queue.push(arguments)};
if(!f._fbq)f._fbq=n;n.push=n;n.loaded=!0;n.version=’2.0′;
n.queue=[];t=b.createElement(e);t.async=!0;
t.src=v;s=b.getElementsByTagName(e)[0];
s.parentNode.insertBefore(t,s)}(window,document,’script’,
‘
fbq(‘init’, ‘481304049944631’);
fbq(‘track’, ‘PageView’);