সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ ন্যায়বিচারেই শান্তির সংস্কৃতি: আইরিন খান বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব ৮ জানুয়ারি দুষ্টের দমনে কঠোর, শিষ্টের পালনে মানবিক হতে হবে: রাষ্ট্রপতি উল্টোপথে গাড়ি চালানোয় মন্ত্রীর গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিচ্ছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হামে আরও ৩ মৃত্যু, নতুন রোগী ১,৪৪৪ বেনজীরের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলকে পুলিশের চিঠি হরমুজে বাংলাদেশের জাহাজে বাধা নেই: ইরান পুলিশের ৬ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বদলি ভোটার স্থানান্তরের আবেদন ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেপুটি স্পীকারের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে আসিফ মাহমুদের দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে দেশে বর্তমান জ্বালানি সংকট উত্তরণে ‘পাঁচ দফা কর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার

আচরণবিধি মানতে ইসির ক্ষমতা প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি: সংলাপে রাজনৈতিক নেতারা

সীমু দা
মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫, ৮:০৭ পূর্বাহ্ন

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলেছেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনার নজির অতীতে নেই; তাই কমিশনের কঠোর ও ক্ষমতা প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সোমবার (১৭ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে তৃতীয় দিনের প্রথম ধাপের ৫টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসলে ইসিকে এসব কথা বলেন তারা। 

বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা জরুরি।’ 

তিনি অবৈধ ও কালো টাকার ব্যবহার বন্ধের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘সংলাপে আমন্ত্রিত সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। বিএনএল নির্বাচন অংশগ্রহণে আগ্রহী, তবে কমিশনের সহযোগিতা অপরিহার্য।’ 

আচরণবিধিতে প্রচারণায় পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও পলিথিন–পিভিসি সামগ্রী নিষিদ্ধের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এটি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জনগণের কাছে পৌঁছাতে পোস্টার–ব্যানার কার্যকর প্রচারণা হাতিয়ার, যা ছাড়া অনেক এলাকায় জনসংযোগ কঠিন হয়ে যায়। তাই এগুলো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা ঠিক হবে না বলে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ মনে করে।’

বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের সভাপতি আবু লায়েস মুন্না বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সংবিধানের ১৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন প্রণীত হয়নি, যা কমিশনকে শক্তিশালী করার পথে বড় ঘাটতি।’

তিনি বলেন, ‘এই আইন দ্রুত পাস করে কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সাংবিধানিক করতে হবে। পাশাপাশি সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করে নির্বাচন কমিশনের বিধিবিধান সংস্কার জরুরি। তার মতে, এমন পরিষদ থাকলে মাসব্যাপী সংলাপের প্রয়োজন পড়তো না।’

বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে—দলগুলোকে আচরণবিধি মানানো হবে কীভাবে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনার নজির অতীতে নেই; তাই কমিশনের কঠোর ক্ষমতা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।’

তিনি মনে করেন, ‘আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য যদি দুই–চারজনের প্রার্থিতা বাতিল করা যায়, তাহলে বাকিদের মধ্যেও শৃঙ্খলা তৈরি হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বড় দলের প্রচারের জন্য পোস্টারের দরকার হয় না, কিন্তু ছোট দলগুলো পরিচিতির অভাবে পোস্টারের ওপরই নির্ভরশীল। তাই পোস্টারের বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।’

ভোটকেন্দ্রে দলীয় এজেন্ট থাকার বিষয়টি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন—তার মতে, ‘দলীয় এজেন্ট ছাড়াই ভোট গ্রহণ সম্ভব, কারণ বড় দলের মানুষই সাধারণত ভেতরে প্রভাব বিস্তার করে এবং ছোট দলের এজেন্টরা প্রবেশাধিকার পায় না। দূরবর্তী ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, এসব কেন্দ্রে পুলিশ থাকে না এবং সেনাবাহিনীও কেন্দ্র পাহারা না দিয়ে সাধারণত বাইরে অবস্থান করে। বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে পারলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, অন্যথায় নিখুঁত নির্বাচন সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘বর্তমান ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আচরণবিধি লঙ্ঘন চিহ্নিত করা সহজ; তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত লঙ্ঘন যেন না ঘটে বা কম ঘটে। আচরণবিধির ব্যাপক প্রচার, সোশ্যাল মিডিয়ার মনিটরিং এবং লঙ্ঘন শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।’ 

সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের সীমিত ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে জনগণ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে, তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

আউট অব কান্ট্রি ভোট (ওসিভি) ও পোস্টাল ব্যালট বাস্তবায়নের উদ্যোগকে যুগান্তকারী বলে প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘৪০ লাখের বেশি বিদেশ প্রবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।’ তবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের প্রসঙ্গ তুলে তিনি পোস্টাল ব্যালটের নিরাপত্তা ও হিসাব–রক্ষণ ব্যবস্থায় বিশেষ সতর্কতার পরামর্শ দেন। 

এ সময় নির্বাচন এজেন্টদের প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতকেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দ্রুত ফ্যাক্ট–চেকিং ও সঠিক তথ্য প্রচারের ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে নির্বাচনে বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করা যায়।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে দেশে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি, যার ফলে সাধারণ মানুষের ভোটের প্রতি আস্থা ক্রমেই কমে গেছে। জনগণ এখন প্রশ্ন তোলে—‘কেন ভোট দেবো, ভোট দিয়ে কী হবে?’ নির্বাচনের প্রতি এই অনাস্থা জাতির জন্য উদ্বেগজনক, কারণ গণভোট ও মানুষের ভোটাধিকারকে সামনে রেখেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে না পারা আমাদের সবার ব্যর্থতা।” 

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘বর্তমান কমিশনের বার্তা স্পষ্ট—আইন লঙ্ঘন করলে কেউই পার পাবে না এবং কোনও বিষয়ে কমিশন আপস করবে না। আরপিও, আচরণবিধি ও সংশ্লিষ্ট আইন শক্তিশালী করে কমিশন এখন কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। মাঠপর্যায়ে ভিজিলেন্স টিম, মনিটরিং টিম, আইনশৃঙ্খলা সেল, ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি টিম ও কমিশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষক দল সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে। প্রতিটি আসনে দুই দল জুডিশিয়াল অফিসার কাজ করবে; জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরা তাৎক্ষণিক বিচার এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন।’

তিনি আরও জানান, রিটার্নিং অফিসার প্রয়োজনে একটি পুরো আসনের ভোট স্থগিত বা বাতিল করতে পারবেন, প্রিজাইডিং অফিসারও প্রয়োজন মনে করলে কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল ঘোষণা করতে পারবেন। দৈত নাগরিকত্ব থাকলে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে না—এ বিষয়েও কমিশন কঠোর থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রচারণায় পোস্টার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল স্বাগত জানিয়েছে। আচরণবিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না বলে কমিশনার পুনর্ব্যক্ত করেন।

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘এবার আচরণবিধিকে প্রথমবারের মতো সরাসরি আরপিওর যুক্ত করা হয়েছে। ফলে আচরণবিধি ভঙ্গ এখন নির্বাচন-পূর্ব অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রার্থীতা বাতিলসহ সংশ্লিষ্ট সব শাস্তি প্রযোজ্য হবে। তাই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি মানাতে অঙ্গীকারনামা বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে—এটি এক ধরনের স্মারক ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উপায়। মসজিদ, মন্দির, কেয়াং, গির্জা, সরকারি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের ৮১ শতাংশ এবং গোলাবারুদের ৭৩ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে। ক্রস-বর্ডার অস্ত্র প্রবাহ ঠেকাতে বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। আউট অব কান্ট্রি ভোটিংকে বড় চ্যালেঞ্জ। তবু কমিশন মাত্র ৯ মাসে জটিল প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে; ভোটের গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই বড় দায়িত্ব। সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার, ডিপফেক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার মোকাবিলায় মনিটরিং সেল গঠন ও জাতিসংঘের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।’ 

এ সময় তিনি বলেন, “আগামীকাল সন্ধ্যায় আমাদের আউট অব কান্ট্রি ভোটিং এর নিবন্ধনের যে প্লটফর্ম ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ লঞ্চ করা হবে।”

নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নয়—এটি গোটা জাতির বিষয়, তাই সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় সবার সহযোগিতা অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠিন হলেও জাতি একসঙ্গে দাঁড়ালে সফলতা সম্ভব, যেমন শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

আগের তিনটি ভালো নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে তিনি বলেন, ‘নেপাল–শ্রীলঙ্কার মতো দেশ পারলে বাংলাদেশও পারবে। কেন্দ্র দখল প্রতিহত করা ও আচরণবিধি মানা রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Theme Created By