। ঘরে ঘরে নতুন কাপড়ের গন্ধ, বাজারে ভিড়, শিশুদের মুখে আনন্দের ঝিলিক- সবকিছু মিলিয়ে উৎসবের প্রস্তুতি। কিন্তু কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপে এমন কিছু ঘর আছে, যেখানে ঈদের আগমনী সুর মানেই বুকের ভেতর চাপা কান্না। সেই ঘরগুলোতে কেউ নতুন কাপড়ের কথা তোলে না। চুলার ধোঁয়া ওঠে ঠিকই, কিন্তু হাঁড়িতে আনন্দ নেই। কারণ, পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি নেই- তিনি এখনো ওপারের বন্দি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক বছরে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে অন্তত পাঁচ শতাধিক জেলে অপহৃত হয়েছেন। সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগ তুলে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় নাফ নদীর মোহনা থেকে। বিজিবি ও প্রশাসনের উদ্যোগে দেড় শতাধিককে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও এখনো প্রায় সাড়ে তিনশ জেলে নিখোঁজ কিংবা জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন। প্রতিটি সংখ্যা মানে একটি পরিবার, একটি ভাঙা ঈদ।
শাহপরীরদ্বীপের জালিয়াপাড়া এলাকার সরু গলিতে ঢুকলেই বোঝা যায় সেই বেদনার চিহ্ন। মো. আবুল কালামের ঘরে এখন নীরবতা। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই এই মানুষটি ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। স্ত্রী বারবার দরজার দিকে তাকান- যেন হঠাৎ করেই তিনি ফিরে আসবেন।
একই চিত্র মো. ছাদেক, আবদুর শুকুর কিংবা তরুণ জেলে রাসেলের ঘরেও। তাদের কেউ বাবা, কেউ ভাই, কেউ আবার সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী। সবচেয়ে বেশি কষ্টের গল্পগুলো শিশুদের ঘিরে। ১১ বছরের রবি আলম আর ১২ বছরের শরিফ- এই বয়সে যাদের ঈদের আনন্দে মেতে থাকার কথা, তারাই এখন বন্দি জীবনের অনিশ্চয়তায় হারিয়ে গেছে।
রবি আলমের মা জমিলা খাতুন বলেন, এই বয়সে ওর স্কুলে থাকার কথা ছিল। অভাবের কারণে নদীতে নামাইছি। এখন ভাবি, ভুল করছি। আমার ছেলেটা কোথায় আছে, বাঁচে না মরে- কিছুই জানি না। এই কষ্ট কাউকে বোঝাইতে পারছি না।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেলে ঘোলারচর এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে একটি নৌকায় থাকা তিনজনকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এর দুই দিন আগে একই এলাকায় আরেকটি নৌকাসহ চারজনকে অপহরণ করা হয়। স্পিডবোটে করে এসে ধাওয়া দিয়ে জেলেদের তুলে নেওয়া হয়- এমনটাই বলছেন স্থানীয় জেলে সমিতির নেতারা।
জেলে আবুল কালামের স্ত্রী রাবেয়া বছরে বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যা হলে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি ফিরে আসবে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসে থাকি- একটা কল আসবে। কিন্তু কিছুই আসে না। ঈদ আসতেছে, কিন্তু আমার ঘরে তো ঈদ নাই। ও ছাড়া এই ঘর একদম ফাঁকা লাগে।
তার মেয়ে খুরশিদা আক্তার বলেন, আব্বু প্রতি ঈদে আমার জন্য লাল জামা আনতো। এবার আমি কিছু চাই নাই। শুধু বলছি, আব্বুকে নিয়ে আসো। আমাদের ঈদটা ফিরায় দাও।
আবদু শুক্কুরে বৃদ্ধা মা হাজেরা খাতুন বলেন, ছেলেটা না থাকলে সংসার চলে না। মাছ ধরেই সব চালাইত। এখন মানুষের কাছ থেকে ধার করে খাই। ঈদের জন্য কিছু কিনবো কেমনে? আমার কাছে ঈদ মানে এখন শুধু দোয়া- আল্লাহ যেন আমার ছেলেটাকে ফিরায় দেয়।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, এভাবে জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন নিয়মিত হয়ে গেছে। প্রতিদিনই আতঙ্ক নিয়ে নদীতে নামেন জেলেরা। কেউ ফিরে আসেন, কেউ আর আসেন না। এই আতঙ্ক শুধু নদীতেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জনপদে। জেলেপল্লির নারীরা এখন স্বামী-সন্তানকে বিদায় দেন এক ধরনের অজানা শঙ্কা নিয়ে। কেউ কেউ আর নদীতে যেতে দিতে চান না। কিন্তু পেটের দায় বড়- তাই ঝুঁকি নিয়েই যেতে হয়।
টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন বলছে, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। অপহৃতদের ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আটক হওয়া অনেক জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩ জন জেলে ফিরে আসার পর শাহপরীরদ্বীপে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। সেই দিন অনেক ঘরে ঈদের আগাম আনন্দ নেমে এসেছিল। কিন্তু নতুন করে অপহরণের ঘটনায় আবারও সেই স্বস্তি উধাও হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মতে, এবারের ঈদে অনেক ঘরেই নতুন কাপড় আসবে না। রান্না হবে না পছন্দের খাবার। ঈদের নামাজ শেষে কেউ হয়তো কবর জিয়ারতে যাবেন, আর কেউ যাবেন নদীর পাড়ে- যেখানে শেষবার দেখা গিয়েছিল প্রিয় মানুষটিকে।
শাহপরীরদ্বীপের বৃদ্ধা কুলসুমা বলেন, ঈদ করে কি করবো বাবা, আমার ছেলে তো নাই। এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে পুরো জনপদের ঈদহীনতা। উৎসবের ভিড়ে এই মানুষগুলোর কান্না শোনা যায় না। কিন্তু নাফ নদীর ঢেউয়ের মতোই তা নিরবচ্ছিন্ন- অদৃশ্য, অথচ গভীর।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নৌকার মালিকদের কাছ থেকে জেনেছি। তাদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।’
সালাউদ্দিন/সাএ
!function(f,b,e,v,n,t,s)
{if(f.fbq)return;n=f.fbq=function(){n.callMethod?
n.callMethod.apply(n,arguments):n.queue.push(arguments)};
if(!f._fbq)f._fbq=n;n.push=n;n.loaded=!0;n.version=’2.0′;
n.queue=[];t=b.createElement(e);t.async=!0;
t.src=v;s=b.getElementsByTagName(e)[0];
s.parentNode.insertBefore(t,s)}(window,document,’script’,
‘
fbq(‘init’, ‘481304049944631’);
fbq(‘track’, ‘PageView’);